স্বর্ণের হিসাব: বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবহার
স্বর্ণ পৃথিবীর প্রাচীনতম মূল্যবান ধাতুগুলোর একটি, যা প্রাচীনকাল থেকে মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও স্বর্ণের চাহিদা বরাবরই অত্যন্ত উচ্চ। এটি শুধু অলংকার তৈরির উপকরণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম মাধ্যম।
এই লেখায় আমরা স্বর্ণের বিশুদ্ধতা, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, এবং সঠিকভাবে স্বর্ণ কেনা-বেচার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব। একই সঙ্গে কিছু সঠিক সূত্র এবং গণনা উপস্থাপন করব যা স্বর্ণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনাকে সাহায্য করবে।
---
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজারের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রতিদিন বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়া-কমার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। সাধারণত বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের হিসাবে, বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম প্রতি ভরিতে (১১.৬৬৪ গ্রাম):
২৪ ক্যারেট স্বর্ণ: ১,১০,০০০ টাকা (প্রায়)।
২২ ক্যারেট স্বর্ণ: ১,০০,০০০ টাকা (প্রায়)।
২১ ক্যারেট স্বর্ণ: ৯৫,০০০ টাকা (প্রায়)।
১৮ ক্যারেট স্বর্ণ: ৮০,০০০ টাকা (প্রায়)।
স্বর্ণের বিশুদ্ধতার ধারণা
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা সাধারণত ক্যারেট (Karat) এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
২৪ ক্যারেট: ১০০% বিশুদ্ধ স্বর্ণ।
২২ ক্যারেট: ৯১.৬% বিশুদ্ধ।
২১ ক্যারেট: ৮৭.৫% বিশুদ্ধ।
১৮ ক্যারেট: ৭৫% বিশুদ্ধ।
উদাহরণ:
ধরা যাক, ২৪ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি গ্রাম ৮,০০০ টাকা। তাহলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম হবে:
= ৮,০০০ × ৯১.৬%
= ৮,০০০ × ০.৯১৬
= ৭,৩২৮ টাকা প্রতি গ্রাম।
---
স্বর্ণের ওজন ও ভরির হিসাব
বাংলাদেশে স্বর্ণের ওজন সাধারণত ভরি এককে মাপা হয়।
১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম।
উদাহরণ:
২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি গ্রাম ৭,৩২৮ টাকা হলে, ১ ভরির দাম হবে:
= ৭,৩২৮ × ১১.৬৬৪
= ৮৫,৪৯৮ টাকা।
---
অলংকার তৈরির খরচের হিসাব
স্বর্ণের অলংকার কেনার সময় শুধু স্বর্ণের দামই নয়, ডিজাইন চার্জ এবং ভ্যাটও (মূল্য সংযোজন কর) যোগ হয়।
মূল সূত্র:
অলংকারের মোট খরচ = স্বর্ণের ওজন অনুযায়ী মূল্য + মজুরি (ডিজাইন চার্জ) + ভ্যাট।
উদাহরণ:
ধরি, আপনি ২২ ক্যারেটের ১.৫ ভরি ওজনের একটি চেইন কিনছেন।
২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি = ৮৫,৫০০ টাকা।
ডিজাইন চার্জ = প্রতি ভরিতে ৫০০ টাকা।
ভ্যাট = মোট দামের ৫%।
ক্যালকুলেশন:
১. স্বর্ণের মোট দাম:
= ১.৫ × ৮৫,৫০০
= ১,২৮,২৫০ টাকা।
২. ডিজাইন চার্জ:
= ১.৫ × ৫০০
= ৭৫০ টাকা।
৩. ভ্যাট:
= (১,২৮,২৫০ + ৭৫০) × ৫%
= ১,২৯,০০০ × ৫%
= ৬,৪৫০ টাকা।
৪. মোট মূল্য:
= ১,২৮,২৫০ + ৭৫০ + ৬,৪৫০
= ১,৩৫,৪৫০ টাকা।
---
পুরানো স্বর্ণ বিক্রির সময় কী করবেন?
পুরানো স্বর্ণ বিক্রির সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
1. স্বর্ণের ওজন এবং বিশুদ্ধতা যাচাই করুন।
2. বাজারের বর্তমান স্বর্ণের দাম জানুন।
3. দোকানদারের কাটছাঁটের (Deduction) হার সম্পর্কে নিশ্চিত হোন।
উদাহরণ:
আপনার কাছে ১ ভরি ২২ ক্যারেটের পুরানো স্বর্ণ রয়েছে এবং দোকানদার ৫% কাটছাঁট করবে।
২২ ক্যারেট স্বর্ণের বর্তমান দাম প্রতি ভরি = ৮৫,৫০০ টাকা।
৫% কাটছাঁট = ৮৫,৫০০ × ৫% = ৪,২৭৫ টাকা।
বিক্রির মূল্য = ৮৫,৫০০ − ৪,২৭৫ = ৮১,২২৫ টাকা।
---
স্বর্ণ কেনার টিপস
১. নির্ভরযোগ্য এবং বাজুস অনুমোদিত জুয়েলারি দোকান থেকে স্বর্ণ কিনুন।
২. প্রতিদিনের স্বর্ণের বাজার মূল্য যাচাই করুন।
৩. ডিজাইন চার্জ এবং ভ্যাটের পরিমাণ সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নিন।
৪. স্বর্ণ কেনার সময় দোকানের দেওয়া সার্টিফিকেট নিন।
---
স্বর্ণ কেনা ও বিনিয়োগের গুরুত্ব
বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক পরিবেশে স্বর্ণ একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। এটি মুদ্রাস্ফীতি থেকে সুরক্ষা দেয় এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করে। বিশেষ করে স্বর্ণের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধির ধারা বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় বিকল্প করে তুলেছে।
---
লেখক:
আহম্মেদ ইমরুল কাউছার
সিইও, ময়নামতি ল্যান্ড সার্ভে এন্ড টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট
Post a Comment