মুসলিম ফারায়েজ ও উত্তরাধিকার: কুরআন, হাদিস ও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিশ্লেষণ

মুসলিম ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার ইসলামী সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট বিধান। মুসলিম ফারায়েজ নির্ধারিত হয় ইসলামী শরীয়াহর ভিত্তিতে, যা কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরাধিকার বণ্টন বা ফারায়েজ একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়, যা মুসলিম সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সকলের অধিকার সংরক্ষণে সহায়ক।

কুরআনের আলোকে মুসলিম ফারায়েজ (উত্তরাধিকার)

উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান আল্লাহ তাআলা কুরআনে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। সুরা নিসা (৪:১১-১২, ৪:১৭৬)-এ আল্লাহ তাআলা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

১. পুত্র ও কন্যার অংশ

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
"يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الأُنثَيَيْنِ ۚ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ۖ وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ..."
(সুরা নিসা, আয়াত ১১)
"তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন: পুত্রসন্তানের জন্য কন্যাসন্তানের দ্বিগুণ অংশ নির্ধারিত। যদি সন্তান কেবল নারীরা হয় এবং তাদের সংখ্যা দুইয়ের বেশি হয়, তবে তাদের জন্য মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ। আর যদি একজন কন্যা থাকে, তবে তার জন্য অর্ধেক।..."

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পুত্রসন্তানদের অংশ কন্যাসন্তানের দ্বিগুণ। অর্থাৎ, পুত্রের জন্য দুটি অংশ এবং কন্যার জন্য একটি অংশ নির্ধারিত।

২. স্ত্রীর অংশ

কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন:
"وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ..."
(সুরা নিসা, আয়াত ১২)
"তোমাদের স্ত্রীরা যদি সন্তান না রেখে মারা যায়, তবে তোমরা তাদের সম্পদের অর্ধেক পাবে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমরা পাবে তাদের সম্পদের চতুর্থাংশ।..."

এখানে স্ত্রীর অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং যদি স্ত্রীর কোনো সন্তান না থাকে, তবে তার সম্পদের অর্ধেক অংশ তার স্বামীকে দেওয়া হবে, আর যদি সন্তান থাকে, তবে স্বামী তার সম্পদের চতুর্থাংশ পাবেন।

৩. পিতামাতার অংশ

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
"وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ ۖ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ..."
(সুরা নিসা, আয়াত ১১)
"যদি সন্তান থাকে, তবে পিতামাতার জন্য মৃত ব্যক্তির সম্পদের ছয় ভাগের এক ভাগ নির্ধারিত। যদি সন্তান না থাকে, তবে মা তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পাবে।..."

এখানে পিতামাতার জন্য নির্দিষ্ট অংশের কথা বলা হয়েছে, এবং সন্তানের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপর নির্ভর করে তাদের অংশ পরিবর্তিত হবে।

৪. ভাই-বোনের অংশ

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
"وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَالَتَبَةٍ أَوْ إِمْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ..."
(সুরা নিসা, আয়াত ১২)
"যদি একজন পুরুষ বা মহিলা মারা যান এবং তার ভাই বা বোন থাকে, তবে তাদের জন্য সম্পদের ছয় ভাগের এক ভাগ নির্ধারিত।..."

এই আয়াতের মাধ্যমে ভাই বা বোনের জন্য উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্ধারিত অংশের পরিমাণ বলা হয়েছে।

হাদিসের আলোকে উত্তরাধিকার

হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) মুসলিম উত্তরাধিকার বণ্টন সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ফারায়েজের মধ্যে যা কিছু আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, তা পালন করো।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৪৫)

এছাড়া আরও একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"তোমাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি তার স্বজনদের মধ্যে ফারায়েজের মাধ্যমে বণ্টন করো, যাতে কেউ অবিচারের শিকার না হয়।"
(সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৮০)

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মুসলিম উত্তরাধিকার

বাংলাদেশে মুসলিম ফারায়েজ সম্পর্কিত আইন মুসলিম পার্সোনাল ল (শরীয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই আইনে মুসলিমদের উত্তরাধিকার বণ্টন কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী নির্ধারিত।

বাংলাদেশের আইনে উত্তরাধিকার বণ্টনেও কুরআন ও হাদিসের বিধান অনুসরণ করা হয়, যেমন:

পুত্রের অংশ কন্যার দ্বিগুণ

স্ত্রীর অংশ, সন্তানের উপস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত

পিতামাতার অংশ, সন্তানের উপস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত

ভাই-বোনের অংশ নির্ধারণ


এই আইনগুলো মানুষের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সকলের অধিকার নিশ্চিত করে।

উপসংহার

মুসলিম ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার একটি অত্যন্ত গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ন বিধান যা ইসলামী শরীয়াহ, কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে নির্ধারিত। ইসলামে উত্তরাধিকার বণ্টন অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং তা বাস্তবায়নে কোনো অবিচার গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার বণ্টন করা এবং নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা।

আল্লাহ বলেন:
"تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ..."
(সুরা নিসা, আয়াত ১৩)
"এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করবে, তাদের তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।..."

এই বিধান অনুসরণ করলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি এবং কল্যাণ লাভ করতে পারব।

লেখক: আহম্মেদ ইমরুল কাউছার (সিইও- ময়নামতি ল্যান্ড সার্ভে এন্ড টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট) 

Post a Comment

Previous Post Next Post