বাংলাদেশে ভূমি জরিপের ইতিহাস ও প্রকারভেদ
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মূলত ভূমি জরিপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ভূমি জরিপ হল নির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ভূমির সীমা, মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া। দেশের সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধরনের ভূমি জরিপ পরিচালিত হয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের ভূমি জরিপের ইতিহাস ও এর প্রকারভেদ।
ভূমি জরিপের ইতিহাস
বাংলাদেশে ভূমি জরিপের ইতিহাস ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হয়। তখনকার শাসকগণ ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ভূমির পরিমাপ ও রেকর্ড সংরক্ষণে ভূমি জরিপ চালু করেন। এই জরিপ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমি মালিকানা চিহ্নিতকরণ, ভূমি কর আদায় এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ চালানো হয়, যা পরবর্তীতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলেও ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ভূমি জরিপ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে, যা ভূমি সংক্রান্ত তথ্যকে আরও নির্ভুল ও সহজলভ্য করে তুলছে।
প্রধান জরিপসমূহ
১. কাদাস্ত্রাল জরিপ (Cadastral Survey - CS)
কাদাস্ত্রাল জরিপ ছিল ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত ভূমি জরিপ পদ্ধতি, যা ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এটি ছিল প্রথম আধুনিক ভূমি জরিপ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্লটের মালিকানা, সীমানা এবং পরিমাণ নির্ধারণ করা হতো। এই জরিপের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমির কর নির্ধারণ এবং মালিকানার যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ করা। জরিপের সময় প্রতিটি জমির জন্য পৃথক মানচিত্র ও খতিয়ান প্রস্তুত করা হতো, যা জমির মালিকানার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যদিও এই জরিপ বেশ নির্ভরযোগ্য ছিল, তবুও সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন কারণে ত্রুটি দেখা দেয়, যেমন নদীভাঙন, ভূমি দখল এবং পরিবর্তিত মালিকানা। ফলে পরবর্তী সময়ে নতুন জরিপের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২. সেটেলমেন্ট জরিপ (Settlement Survey - SA)
সেটেলমেন্ট জরিপ মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে ভূমি কর ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য চালু করা হয়েছিল। ১৯২৩ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সম্পন্ন এই জরিপে জমির ধরন, ব্যবহার, মালিকানা ও কর নির্ধারণ করা হতো। এটি কাদাস্ত্রাল জরিপের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমির প্রকৃত ব্যবহার এবং মালিকানার হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা। এই জরিপে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত করা হতো এবং জমির মালিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করা হতো। সেটেলমেন্ট জরিপের মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে ভূমিকা রাখা হয়, তবে এটি সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে একে ধীরে ধীরে উন্নত পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
৩. রিভিশনাল সেটেলমেন্ট জরিপ (Revisional Settlement Survey - RS)
রিভিশনাল সেটেলমেন্ট জরিপ ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে পরিচালিত হয় এবং এটি পূর্ববর্তী জরিপগুলোর ত্রুটি সংশোধনের জন্য পরিচালিত হয়। সময়ের সাথে সাথে জমির মালিকানা পরিবর্তন, কৃষি জমির রূপান্তর এবং নগরায়নের ফলে ভূমি ব্যবস্থায় নানা জটিলতা দেখা দেয়। রিভিশনাল সেটেলমেন্ট জরিপের মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করা হয় এবং মালিকানার হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটি আদালতে জমি সংক্রান্ত মামলা মোকদ্দমার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, এই জরিপ প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়।
৪. বাংলাদেশ রিভিশনাল সেটেলমেন্ট জরিপ (Bangladesh Revisional Settlement Survey - BRS)
বাংলাদেশ রিভিশনাল সেটেলমেন্ট জরিপ (BRS) স্বাধীনতার পর ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার লক্ষ্যে চালু করা হয়। ১৯৮৪ সালের পর থেকে এই জরিপ ব্যবস্থা কার্যকর হয় এবং বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমি জরিপ পরিচালিত হচ্ছে। এই জরিপের মূল লক্ষ্য হল ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ কমানো, ভূমির কর ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ভূমির ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ করা। BRS-এর মাধ্যমে ভূমির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে এবং জনগণের জন্য ভূমি সংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য হয়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ভূমি জরিপ ব্যবস্থা ক্রমাগত আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ডিজিটাল ভূমি জরিপ ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা কমছে এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হচ্ছে। ভূমি জরিপের মাধ্যমে জমির সঠিক পরিমাপ, মালিকানা সংরক্ষণ এবং কর নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে।
সঠিক ভূমি জরিপ নিশ্চিত করা গেলে— ✅ জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ কমবে। ✅ ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। ✅ জমির তথ্য দ্রুত ও সহজে পাওয়া যাবে। ✅ সরকার ভূমি রাজস্ব আদায় আরও কার্যকরভাবে করতে পারবে।
বর্তমানে ডিজিটাল জরিপ পদ্ধতি চালু হওয়ায় ভূমি সংক্রান্ত কাজ আরও সহজতর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে, যা ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলবে।
Post a Comment